Ticker

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Responsive Advertisement

বৈদেশিক ঋণের চাপ ও বড় প্রকল্পের ভূমিকা

বড় প্রকল্পের নামে ঢালাওভাবে বিদেশি ঋণ গ্রহণ সরকারের জন্য একটি গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দেখা যাচ্ছে, এসব প্রকল্প থেকে অর্জিত সুবিধা আর্থিক দায়ের তুলনায় নিতান্তই কম। বরং কর্ণফুলী টানেলের মতো কিছু প্রকল্প এখন সরকারের জন্য আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরপরই শুরু হয়েছে সুদ ও আসল পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, অথচ অর্থনীতিতে এর প্রত্যাশিত সুফল দেখা যাচ্ছে না।



এক গবেষণায় প্রকাশ, ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মোট ব্যয়ে দেশের ২০টি বড় প্রকল্পের জন্য প্রায় ৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গৃহীত এই ঋণের বোঝা এখন পরবর্তী সরকারের ঘাড়ে চেপেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্রের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা ২০২৮ সালে তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২.৭৩ বিলিয়ন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ করতে হবে। সীমিত রাজস্ব আহরণ ও রেমিট্যান্স আয়ের কারণে এ চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, বড় প্রকল্পের বিপরীতে নেওয়া ঋণ পরিশোধের এই চাপ রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গৃহীত ২০টি মেগা প্রকল্পে ৪৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ রাশিয়াকে (৩৬.৬%), জাপানকে (৩৫%), এবং চীনকে (২১%) পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও অন্যান্য সংস্থার ঋণও রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত দেশের বিদেশি ঋণের বকেয়া ৬২.৪ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১.৭৪ বিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২.৪৭ বিলিয়ন এবং চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

এই ঋণ দায় দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, "কিছু প্রকল্পে যাচাইবাছাই ছাড়াই বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এসব ঋণের কতটা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়েছে আর কতটা পাচার হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।" তিনি উল্লেখ করেন, "যদি ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হতো, তাহলে অর্থনীতিতে এর সুফল পাওয়া যেত। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রকল্প কোনো কাজেই আসছে না।"

তিনি উদাহরণ হিসেবে খুলনার খালিশপুরে স্থাপিত রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে। প্রকল্পটি প্রায় সম্পন্ন হলেও গ্যাস সংকটের কারণে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ কারণে প্রকল্পটির ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ড. জাহিদ আরও বলেন, "যারা ঋণ নিয়েছেন তাদের যেমন দায় রয়েছে, তেমনই দায় রয়েছে ঋণদাতা সংস্থাগুলোরও। যদি ঋণদাতারা সঠিক যাচাই-বাছাই করতেন, তবে ঋণের বোঝা এতোটা ভারী হতো না। এখন জনগণের করের টাকায় এসব ঋণের দায় মেটাতে হচ্ছে, যার বড় অংশ সম্ভবত অপচয় বা পাচারের শিকার।"


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ